বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ভিত্তি বুঝতে হলে একাত্তরের মূল প্রেক্ষাপটের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পাকিস্তানি শাসনামলের শেষ পর্যায়ে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে যে শক্তি সবচেয়ে সক্রিয় ছিল, তা হলো মুসলিম লীগ। আজ যদি মুসলিম লীগ বিলীন হয়ে না যেতো—তাহলে জামাতে ইসলামী কখনোই আজকের রাজনৈতিক অবস্থান, জনসংখ্যা বা সংগঠনিক প্রভাব অর্জন করতে পারতো না।
এই আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো—স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির শেকড় কোথায়, কীভাবে তারা বেঁচে উঠেছে, কেন পশ্চিমা শক্তি তাদের কিছু অংশকে ব্যবহার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কেন বাংলাদেশ আর কখনোই পাকিস্তানি ধাঁচের রাষ্ট্রে ফিরে যাবে না।
একাত্তরের প্রেক্ষাপট: মুসলিম লীগের প্রভাব ও জামাতের উত্থান
স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে যে পিস কমিটি গঠিত হয়, তার জেলা, মহকুমা, থানা এবং বিশেষ করে ইউনিয়ন লেভেলে বেশিরভাগ কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য ছিলেন মুসলিম লীগের নেতারা।
এই কমিটির অধীনেই পরিচালিত হয়—
- রাজাকার বাহিনী
- আল-বদর
- আল-শামস
এদের প্রধান আদর্শগত ও সাংগঠনিক গাইড ছিল মুসলিম লীগ। জামাত তখনও ছিল তুলনামূলক ছোট শক্তি—সংখ্যায় কম এবং সংগঠনে সীমিত। তারা মুসলিম লীগের অধীনস্থ একধরনের আদর্শিক বাহিনী হিসেবেই কাজ করত।
অর্থাৎ মুসলিম লীগ টিকে থাকলে আজকের রাজনীতিতে জামাতের প্রভাব এই পরিমাণে বাড়তোই না।
স্বাধীনতার পরে মুসলিম লীগের পতন ও BNP–তে অন্তর্ভুক্তি
স্বাধীনতার পর পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে। মুসলিম লীগ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে ভেঙে যায়।
১৯৭৫–পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের সময়—
- মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতা বিএনপি–তে যোগ দেন
- কিছু নেতা পরবর্তীতে জাতীয় পার্টিতে স্থান করে নেন
- একই সময়ে জিয়াউর রহমান নিষিদ্ধ জামাতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তাদের রাজনীতির সুযোগ দেন
উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি শক্তিশালী ডানপন্থী ব্লক তৈরি করা। তবে বিএনপির ভেতরে তখনও মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয়তাবাদী ও মূলধারার রাজনীতিবিদদের উপস্থিতির কারণে পশ্চিমা শক্তির কাঙ্ক্ষিত কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদেও ‘পশ্চিমা নকশা’ সফল হয়নি
খালেদা জিয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদ—দুটো সময়েই আন্তর্জাতিকভাবে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদের জামাত বিএনপির সাথে সরকারে স্থান করে নেয়। এই প্রথম স্বাধীনতা বিরোধী দল জামাতের গাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা শোভা পায়। তাদের আস্ফালন বেড়ে যায়। খালেদা জিয়ার ঐ সময়কালেই হুরকাতুল জিহাদ, জেএমবি ইত্যাদি জঙ্গি সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
তবুও—
- জাতীয়তাবাদী ধারা
- মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদদের প্রভাব
- অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ
এগুলো বিএনপিকে পুরোপুরি পাকিস্তানপন্থী বা ইসলামিস্ট নকশায় ঢুকতে দেয়নি।
মঈনউদ্দিন–ফখরুদ্দিনের সময়: ব্যর্থ “মাইনাস–২ ফর্মুলা”
২০০৭–০৮ এর সেনা–সমর্থিত সরকারের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক মাঠ পুনরায় সাজানো।
তারা চেয়েছিল—
- আওয়ামী লীগ থেকে শেখ হাসিনা বাদ
- বিএনপি থেকে খালেদা জিয়া বাদ
কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই মাইনাস–২ বৈধতা দেয়নি।
ফলে সেই প্রকল্পও ভেস্তে যায়। উল্লেখ করার বিষয় হলো, ওই সময়েই বর্তমান অন্তবর্তীকালিন সরকার প্রধান ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস রাজনীতিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
জুলাই ২৪: জঙ্গিবাদ ব্যবহারের নতুন কৌশল
আওয়ামীলীগের ১৫-১৬ বছরের শাসনে কোনো জঙ্গি সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।
রাজনৈতিক প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর পশ্চিমা শক্তির ভেতর একটি অংশ ভিন্ন পথ বেছে নেয়—
জঙ্গি গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার।
এই ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতিতেই ঘটে ২৪ জুলাই—যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং পুরো দেশকে সংকটে ফেলে।
জামাতের রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ: অন্যের কাঁধে ভর করার ইতিহাস
জামাতের বৈশিষ্ট্য খুব স্পষ্ট—
- কখনোই একক শক্তি নয়
- সবসময় অন্যের কাঁধে ভর করে চলা
- সুযোগ পেলেই মিত্রকে ছুঁড়ে ফেলা
এদের ভোটব্যাংকও সীমিত—
৬–১০ শতাংশের বেশি কোনো সময়েই হয়নি।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধ ও স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামাত নিষিদ্ধ ছিল।
পুনরায় রাজনৈতিক বৈধতা দেয় জিয়াউর রহমান।
কিন্তু জামাত আজও পুরোপুরি স্বাধীনতাকে স্বীকার করে না।
তাদের দণ্ডপ্রাপ্ত মহাসচিব আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ বলেছিলেন—
“এ দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধটুদ্ধ হয়নি; যা হয়েছে তা ছিল ভাইয়ের ভাইয়ে দ্বন্দ্ব।”
এটাই তাদের প্রকৃত রাজনৈতিক দর্শন।
সাম্প্রতিক অস্থিরতা: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করে রাজনৈতিক ফাঁকা মাঠ তৈরি
রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে জামাত সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে—
কারণ এই অস্থিরতা থেকে তারা একক সুবিধা নিতে চায়।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও দেখা গেছে—
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে জামাত মনে করেছে রাজনৈতিক মাঠ ফাঁকা হয়ে গেছে।
কিন্তু বিএনপি ও জামাত—এ দুটি শক্তির স্বার্থ কখনোই দীর্ঘমেয়াদে এক হবে না।
জামাত সুযোগ দেখলেই বিএনপিকে ছুঁড়ে ফেলবে—ইতিহাস তার প্রমাণ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: এই দেশ কখনো পাকিস্তান হবে না
বাংলাদেশের জনগণ, রাষ্ট্রীয় চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ—সবকিছুই পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীত।
তাই—
✔ বাংলাদেশ পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিতে ফিরবে না
✔ বাঙালি জাতি দমিয়ে রাখা যায় না
✔ স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্ত বারবার ব্যর্থ হয়েছে
✔ পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ আজও বন্ধ
✔ জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি
জামাত যতই স্বপ্ন দেখুক,
এই বাংলাদেশ আর কখনো পাকিস্তানি পথে যাবে না।
এটাই এই ভূখণ্ডের স্থায়ী সত্য।
উপসংহার
আজ যদি মুসলিম লীগ টিকে থাকতো—জামাত এতো বড় রাজনৈতিক অবস্থান দখল করতে পারতো না।
কিন্তু স্বাধীনতার পর মুসলিম লীগের বিলীন হয়ে যাওয়া এবং জিয়াউর রহমানের আমলে জামাতের পুনরুত্থান—এই দুই প্রক্রিয়াই পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিকে নতুন রূপ দেয়।
তবুও জনগণের শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতীয় ইতিহাস—জামাতসহ সব স্বাধীনতাবিরোধী চেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রকৃত রক্ষাকবচ।
বাংলাদেশের যাত্রা সামনে—পেছনে নয়।








Leave a Reply